শব্দ করে পড়ি, নিজেকে আবিষ্কার করি

শব্দ করে পড়ি, নিজেকে আবিষ্কার করি

“শব্দ করে পড়ি, নিজেকে আবিষ্কার করি”। এ কথাটি হয়তো অনেকের কাছে নতুন শোনাচ্ছে। কেউ কেউ হয়তো বুঝতেও পারছেন না। কারণ আমাদের দেশের শিশুরা ও শিক্ষার্থীরা জোরে বা শব্দ করে পড়ার উৎসাহ একেবারেই হারিয়ে ফেলেছেন। এ বিষয়ে খুব একটা খেয়াল করছেন না অভিভাবকরাও।

কথাগুলো বলছিলেন রূপ বাংলা কমিউনিকেশনের কর্ণধার রূপক সিংহ। “শব্দ করে পড়ি, নিজেকে আবিষ্কার করি” বার্তাটি নিজ উদ্যোগে সকলের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি এসব কথা বলেন।

রূপ বাংলা কমিউনিকেশনের কর্ণধার রূপক সিংহ রুপক সিংহা কবিতার পংক্তির সাথে তাল মিলিয়ে বলেন, ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে শব্দ করে পড়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা আমাদের জানতে হবে।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য মতে, আমাদের দেশে শিশুদের মোট তিন ভাগে ভাগ করা হয়, ৫ বছরের নিচে শৈশবকাল, ৬ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বাল্যকাল এবং ১১ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কৈশোরকাল। সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪৫ ভাগ অর্থাৎ ৬ কোটি ৩০ লক্ষ শিশু, যাদের বয়স ১৮ এর নিচে। এই সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে এখন অনেক বেড়েছে।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাচ্চাদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা নির্ভর করে বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এরমধ্যে শিশু শিক্ষা ও সামাজিকীকরণ অন্যতম। খুব ছোট থেকেই একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটতে শুরু করে। তাই ভালো ভালো অভ্যাসগুলো যাতে ছোট থেকেই শিশুকে রপ্ত করানো যায় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। যেমন, শিশুদের শব্দ করে পড়ার অভ্যাস।

রূপক সিংহ বলেন, রিড অ্যালাউড বা শব্দ করে পড়ার প্রচলন আমাদের সময়ে থাকলেও এখন আর নেই। যার কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা হৃদয়াঙ্গম করা পড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই আমি আবারও সবার মধ্যে ‘শব্দ করে পড়ি, নিজেকে আবিষ্কার করি’ বার্তাটি পৌঁছে দিতে মাঠে নেমেছি। এজন্য সকল অভিভাবককে এগিয়ে আসতে হবে। বার্তাটি সকলের মাঝে ভালোভাবে পৌঁছে দিতে পারলে আগামী প্রজন্ম শিক্ষার মাপকাঠিকে সমুন্নত রাখতে পারবে। আরো পারবে মেধা ও মনন বিকশিত করতে এবং নিজের মধ্যে আগামীর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে।

তিনি বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন জোরে জোরে না পড়লে রীতিমতো শিক্ষক, বাবা-মা তিরষ্কার করতেন! কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েদের সেভাবে শব্দ করে পড়ার জন্য অভিভাবকদের পক্ষ থেকে খুব একটা জোর দেওয়া হয়না। যার কারণে শিক্ষার্থীরা নিজেকে উপস্থাপন করার মধ্যে বিষণ্ণতায় ভোগে। তাদের মধ্যে অনাবিল আনন্দ এবং উচ্ছ্বাস বলে কিছুই থাকে না। অনেক জানা জিনিসও সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করে মানুষের মন জয় করতে পারে না। এ যেন নিজের মধ্যেই নিজেকে লুকিয়ে রাখা!

শব্দ করে পড়া ইতোমধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অভিভাবকরাও বুঝতে পারছেন, শিশুদের মানসিক বিকাশে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তাই সরকারের সহায়তায় এই তথ্যটি শিশুদের বাবা মা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। শব্দ করে পড়ার মাধ্যমে পারিবারিকভাবে যত্ন নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ-সবল শিশু বেড়ে উঠুক এটাই হোক আমাদের চাওয়া। এজন্য প্রতিদিন অন্তত বিশ মিনিট একটি শিশুকে শব্দ করে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

রূপক সিংহ আরো বলেন, আমরা আমাদের সময় যে কবিতা পড়েছি সেই কবিতা অক্ষরে অক্ষরে শ্রুতিমধুরভাবে এখনও বলে যেতে পারি। দুঃখজনক হলেও সত্য এখনকার অধিকাংশ শিশুদের মধ্যে এই ধারণ ক্ষমতা নেই বললেই চলে। তাই “শব্দ করে পড়ি, নিজেকে আবিষ্কার করি” বার্তাটি সারাদেশে মানুষের মুখে মুখে পৌঁছাতে আমি একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি স্কুলগুলোতে ক্যাম্পেইন করতে চাই। এজন্য সরকারি-বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজন। তবে যদি শেষ পর্যন্ত কোনো সহায়তা নাও পাই শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য আমি নিজ উদ্যোগে এই স্লোগানকে বুকে ধারণ করে যতদূর সম্ভব এগিয়ে যাওয়া যায় সেই চেষ্টাই করবো। আসুন নিজের সন্তানকে আগামীর সাথে তাল মিলিয়ে শব্দ করে পড়তে উৎসাহ দেই, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিক্ষা খাতকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাই।

এ বিষয়ে ডাঃ এম আর খান শিশু হসপিটালের পরিচালক ও শিশু চিকিৎসক ডাঃ এন কে ঘোষ (সুমন) বলেন, যা শিখতে হবে সে ব্যাপারে আকর্ষণ অনুভব করতে হবে। মানুষ যখন কোন বিষয়ের ওপর আকর্ষণ দেয় তখন তা সে সহজেই মুখস্থ করে ফেলতে পারে। আমাদের স্মৃতি গঠন বা মেমোরি ফার্নিশনের জন্য মূল ভুমিকা পালন করে মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম। আরো সুস্পষ্ট করে বললে এই সিস্টেমের হিপ্পো কেম্পাস আনন্দের ও কষ্টের অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত। আনন্দ ও কষ্টের বিষয়গুলির প্রতি আমাদের এক ধরণের আকর্ষণ কাজ করে। তাই এটা সবসময় আনন্দের বা কষ্টের বিষয়গুলোকে দ্রুত স্মৃতি বা মেমোরিতে রুপান্তর করে ফেলে। ফলে মানুষ কষ্টের স্মৃতি কখনও ভুলে না। সাথে সাথে আনন্দের ঘটনাগুলোও স্থায়ী স্মৃতি বা পারমানেন্ট মেমোরিতে যায়। তো কোনকিছু শিখতে চাইলে আগে বিষয়টির ব্যাপারে আকর্ষণ জাগাতে হবে। খেয়াল করে চোখ দিয়ে দেখে পড়তে হবে। মানুষ যা কিছু মনে রাখার চেষ্টা করে তার মধ্যে সবচেয়ে সহজে মনে থাকে ভিজুয়্যাল মেমোরি। অর্থাৎ যা মানুষ চোখে দেখে মনে রাখে এবং ভালো উচ্চারণ ও মনে রাখার জন্য শব্দ করে পড়ার বিশেষ প্রয়োজন আছে। কারণ তাতে পড়ার কনসেনট্রেশন বেশি আসে। বাইরের কোন সমস্যা তাকে বিরক্ত করতে পারে না এবং মনের একাগ্রতা বাড়ে। আমরা, শিক্ষক ও অভিভাবকরা হয়তো এ বিষয়টি এখনও গুরুত্ব দিয়ে ভাবিনা, তবে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে, শিশুদের শব্দ করে পড়া ও পড়ানোর অভ্যাস গড়ে তোলা, একটি নিরব আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ বিশ্বব্যাপী বেশ কিছু সংগঠন পালন করে থাকে (ওয়ার্ল্ড রিড এলাউড ডে) অর্থাৎ বিশ্ব শব্দ করে পড়া দিবস!

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিন এর অধ্যাপক ড. অ্যালেন ম্যান্ডেলসন শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৬৭৫টি পরিবারের শিশুদের ওপর জরিপ চালিয়ে সিদ্ধান্তে আসেন, শব্দ করে পড়া শিশুর সামাজিক আবেগ অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি এই বিষয়ে একাধিক প্রবন্ধে শিশুর শব্দ করে পড়ার সাথে সামাজিক বিকাশের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন।

এছাড়া, নিউইয়র্ক টাইমস্ এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাচ্চাদের শব্দ করে পড়ালে তারা শুদ্ধভাবে দ্রুত মাতৃভাষা শিখতে পারে। শুনলে হয়তো অবাক হতে হবে, প্রাচীন গ্রিস ও রোমে বন্ধুরা একসাথে জড়ো হতো ও একজন আরেকজনকে গল্প পড়ে শোনাতো। যারা এ বিষয়ে পারদর্শী ছিলো তাদের যোগ্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। শিশুর শব্দ করে পড়ার বেশ কিছু উপকারিতা হলো, যেকোন বই পড়ায় পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া যায় ও বইটি উপভোগ করা যায়। পড়ায় কোথাও ভুল হলে অন্যরা শুধরে দিতে পারে। এছাড়া নিয়মিত চর্চার ফলে উচ্চারণ সাবলীল ও শুদ্ধ হয়। শিশুর অবাচনিক ভাবপ্রকাশ, মুখভঙ্গি, কন্ঠের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। বাক্যের গঠন, বর্ণনা, রচনাশৈলী ও ভাবের সাথে একাত্ম হওয়া যায়। তাই খুব সহজে ভালো লেখার কৌশল বুঝতে পারা যায়। শব্দ করে পড়ার ফলে লেখার মাঝে নিজেকে খুঁজে পেতে পারে শিশুটি। তাই গল্পের সাথে তার একরকম মিথস্ক্রিয়া তৈরি হয়। একইসাথে বাচ্চাদের ভাবাবেগ, আচরণ ও মনোযোগের উন্নতি ঘটায়। শব্দ করে পড়া শিশুরা অধিক যোগাযোগমুখী জিজ্ঞাসু ও অন্যদের সাথে মেশার ক্ষেত্রে আগ্রহী হয়। একইসাথে আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ এবং পড়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।

বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও লেখক কার্ল সেগান বলেছেন, ছোটদের জন্য বড়দের আদর্শ উপহার হচ্ছে বই পড়ে শোনানো। তাই শব্দ করে পড়ার ফলে সন্তান ও পিতা-মাতার মধ্যে এক ধরনের জ্ঞানভিত্তিক সম্পর্ক তৈরি হয়। পিতা-মাতা, শিশু ও বই এই তিনের সমন্বয়ে শিশুদের নেতিবাচক আচরণ, বদমেজাজ ও শঠতা থেকে দূরে রাখা যায়। ওরা কোমল হৃদয়ের মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে। এছাড়া, শিশুর পড়ার অসুবিধা, রিডিং ডিসওর্ডার বা ডিক্সোল্সিয়া (dyslexia) রোগ আছে কিনা বুঝা যায় এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা যায়।

বিশেষ সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, রিডএলাউড অর্গানাইজেশন

Leave a Comment